নিজস্ব প্রতিবেদক
২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, 8:28 PM
আহমেদবাগে আফরোজা আইরিন তিন্নি হত্যাকাণ্ড : অনেক প্রশ্ন
রাজধানীর আহমেদবাগে গত ১৪ সেপ্টেম্বর রাতে আফরোজা আইরিন তিন্নি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় তার ভাই খান আলম খান ওরফে বাবু ও তার স্ত্রী ফাতেমা বেগমের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।
পারিবারিক সূত্র ও স্বজনদের দেওয়া ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে পৈতৃক সম্পত্তিসহ বিভিন্ন পারিবারিক বিষয় নিয়ে তিন্নির ভাই-বোনদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। এসব বিরোধের সমাধানের জন্য তিনি চাঁদপুর থেকে ঢাকায় আসেন। নিহত তিন্নি দুই সন্তানের জননী। তার স্বামী চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার আলোনিয়া মসজিদের ইমাম। তাদের বড় ছেলে ২০ বছর বয়সী এবং কুমিল্লা কলেজের ছাত্র। ছোট ছেলের বয়স পাঁচ বছর।
পরিবারের অভিযোগ, পারিবারিক বিরোধের সমাধান যাতে না হয়, সে উদ্দেশ্যে তিন্নিকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। ঘটনার রাতে আহমেদবাগের ৩৬/৩/১ নম্বর বাড়িতে পারিবারিক বৈঠক বসে। রাত প্রায় ১০টা পর্যন্ত বৈঠক চলে। সেখানে কোনো সমাধান না হওয়ায় সবাই চলে যান।
স্বজনদের অভিযোগ, বৈঠক শেষ হওয়ার কিছু সময় পর খান আলম খান ওরফে বাবু ও তার স্ত্রী ফাতেমা তিন্নির ওপর হামলা করেন। অন্ধকারে পেছন থেকে হামলা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। হামলার পর তিন্নি বাড়ির উঠানের ইট বিছানো রাস্তায় পড়ে যান। পরে স্বজনরা তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় মুগদা হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে দুই দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর তার মৃত্যু হয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে ১৭ সেপ্টেম্বর চাঁদপুরে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
ঘটনার সময় তিন্নির ভাবী তানিয়া ও বড় বোন দিলরুবা ওরফে মুন্নি বিষয়টি দেখতে পান বলে স্বজনরা জানান। তারা দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের খবর দেন। পরে তিন্নিকে তার বড় ভাই শরিফুল হাসানের বাসায় নেওয়া হয়। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, তখন তিন্নির কণ্ঠ ক্ষীণ হয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘বাবু ও তার স্ত্রী আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে।’ এরপর বড় ছেলে ইমতিয়াজকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘বাবা, আমি মারা যাচ্ছি।’ কিছুক্ষণ পর তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন এবং বমি করতে থাকেন।
এ ঘটনায় নিহতের ছেলে ইমতিয়াজ শাহারিয়া (তন্ময়) সবুজবাগ থানায় মামলা করেন। মামলার নম্বর ৩০, তারিখ ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
মামলা হওয়ার পরও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে পরিবারের অভিযোগ। তাদের দাবি, অভিযুক্তরা এলাকায় প্রকাশ্যে চলাফেরা করছে।
পরিবারের অভিযোগ, মামলা দায়েরের পর গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১০টার দিকে খান আলম খান ওরফে বাবু, তার স্ত্রী ফাতেমা, শাশুড়ি, শালা রিফাতসহ আরও কয়েকজন ওই পরিবারের স্বজনদের বাড়িতে হামলা চালান। এ সময় তারা বাড়ির গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন এবং নিহত আফরোজা আইরিনের ভাই, ভাবী ও তাদের সন্তানদের ওপর হামলার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ করা হয়।
পরিবারের সদস্যরা প্রাণভয়ে দরজা-জানালা বন্ধ করে দেন। এ সময় শরিফুল হাসান লিটন মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলে হামলাকারীরা দ্রুত বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর বাইরে থেকে বাঁশ ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং অকথ্য ভাষায় গালাগাল করা হয়। পরিবারের দাবি, প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে এ পরিস্থিতি চলতে থাকে।
পরে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করা হলে সবুজবাগ থানা থেকে পুলিশ গিয়ে শরিফুল হাসান লিটনকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। সেখানে তিনি ওসির কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।
নিহতের পরিবার ও মামলার বাদীপক্ষের অভিযোগ, আফরোজা আইরিনের হত্যাকাণ্ডের পরও তাদের ওপর হামলা ও হত্যার হুমকি অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় অভিযুক্তরা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে বলেও তারা দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা এবং নিহতের পরিবার ও মামলার বাদীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও পুলিশের কার্যকর ভূমিকারও দাবি জানিয়েছেন তারা।