সিপন আহমেদ, মানিকগঞ্জ
২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫, 4:25 PM
ল্যাব ইনচার্জ নেই, তবু রিপোর্টে স্বাক্ষর আল শেফা প্যাথলজিতে অনিয়মের অভিযোগ
মানিকগঞ্জে একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দেওয়া পরীক্ষার রিপোর্টে ল্যাব ইনচার্জ হিসেবে এমন এক চিকিৎসকের সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে, যিনি তিন বছর আগে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন। এ ঘটনা ঘিরে সংশ্লিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্যক্রম নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে একই রোগীর একই পরীক্ষার ফল তিনটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তিন রকম আসায় ল্যাব পরীক্ষার মান ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
রুনা আক্তার (৩৪) নামের এক নারী বেশ কিছুদিন ধরে এলার্জি সমস্যায় ভুগছিলেন। মুখ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত ও চুলকানি দেখা দিলে তিনি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। গত ১২ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকার বেসরকারি আল শেফা এক্স-রে অ্যান্ড প্যাথলজি সেন্টারে চিকিৎসক মো. মীর হোসেনকে দেখান তিনি। চিকিৎসক তাকে এসজিপিটি পরীক্ষা করাতে বলেন।
এসজিপিটি হলো সিরাম গ্লুটামিক পাইরুভিক ট্রান্সঅ্যামিনেজ। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এটি ALT (Alanine Aminotransferase) নামেও পরিচিত। মূলত যকৃত বা লিভারের কার্যকারিতা নির্ণয়ের জন্য এই পরীক্ষা করানো হয়। লিভারে প্রদাহ, সংক্রমণ, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা অন্যান্য জটিলতা থাকলে এসজিপিটির মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। দীর্ঘদিনের এলার্জি, চুলকানি বা ত্বকের সমস্যার ক্ষেত্রেও অনেক সময় চিকিৎসকরা লিভারের অবস্থা যাচাই করতে এ পরীক্ষা করাতে বলেন।
আল শেফা এক্স-রে অ্যান্ড প্যাথলজি সেন্টারে পরীক্ষা করানোর পর রুনা আক্তারের এসজিপিটির ফল আসে ৫২ ইউ/এল। অর্থাৎ প্রতি লিটার রক্তে এসজিপিটি এনজাইমের পরিমাণ ৫২ ইউনিট। রিপোর্ট দেখে চিকিৎসক তাকে এক সপ্তাহ ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেন এবং প্রয়োজনে ঢাকায় উন্নত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কথাও বলেন।
তবে রিপোর্টের ফলাফল নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে রুনা আক্তার একই পরীক্ষা আবার করান বাসস্ট্যান্ড এলাকার সেন্ট্রাল স্পেশালিস্ট হাসপাতালে। সেখানে ফল আসে ৩০ ইউ/এল। এতে আরও বিভ্রান্ত হয়ে তিনি বেউথা রোডের নির্বাচন অফিস সংলগ্ন আফরোজা বেগম জেনারেল হাসপাতালে পুনরায় পরীক্ষা করান। সেখানে ফলাফল আসে ২৫ ইউ/এল।
একই পরীক্ষার তিনটি ভিন্ন ফলাফল পাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েন রুনা আক্তার ও তাঁর পরিবার। কোন রিপোর্টের ভিত্তিতে চিকিৎসা নেবেন—তা নিয়ে তারা চরম বিভ্রান্তিতে পড়েছেন।
রুনা আক্তারের স্বামী মামুন মিয়া বলেন, ‘আল শেফার রিপোর্ট অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু হয়েছিল। কিন্তু সন্দেহ হওয়ায় আরও দুই জায়গায় পরীক্ষা করাই। প্রত্যেক জায়গায় আলাদা ফল আসে। তাহলে কোন রিপোর্টকে সঠিক ধরে চিকিৎসা করব?’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের জেলার অধিকাংশ মানুষ গরিব। একবার পরীক্ষা করানোই কষ্টের। ভুল রিপোর্ট হলে সেই ভুলের ওপর ভিত্তি করেই চিকিৎসা নিতে হয়। এতে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।’
এদিকে আল শেফা এক্স-রে অ্যান্ড প্যাথলজি সেন্টারের দেওয়া পরীক্ষার রিপোর্টে দেখা যায়, সেখানে ডা. এটিএম মুক্তার হোসাইন নামের এক চিকিৎসকের সিল ও স্বাক্ষর রয়েছে। তাঁকে ‘ল্যাব ইনচার্জ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট প্যাথলজি সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, তিনি তিন বছর আগে প্রতিষ্ঠানটি থেকে চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন। বর্তমানে তাঁর কোনো মোবাইল নম্বর বা যোগাযোগের তথ্যও কর্তৃপক্ষের কাছে নেই।
প্যাথলজি সেন্টারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে সেখানে ল্যাব ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শরীফুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি। তিনি জানান, তিনি ‘কনফিডেন্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা করেছেন। তবে রিপোর্টে এমন ভিন্নতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিভিল সার্জন কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘কনফিডেন্সের মতো প্রতিষ্ঠানের সনদ আমরা অনুমোদন করি না। পরিদর্শনের সময় অনেক প্রতিষ্ঠান স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে উত্তীর্ণ ল্যাব টেকনোলজিস্টদের কাগজপত্র দেখায়।’
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম মোফাখখারুল ইসলাম বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। আল শেফা এক্স-রে অ্যান্ড প্যাথলজিতেও শিগগিরই অভিযান চালানো হবে। সেখানে কোনো অনিয়ম বা অসংগতি পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ল্যাব পরীক্ষার রিপোর্টে এমন অনিয়ম ও অসামঞ্জস্য রোগীর চিকিৎসাকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। এ ক্ষেত্রে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি তদারকি আরও জোরদার করা জরুরি