সিপন আহমেদ, মানিকগঞ্জ
২০ এপ্রিল, ২০২৬, 8:31 PM
মানিকগঞ্জের দুই উপজেলায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচি ৫৪ দিনে খাবার মিলেছে মাত্র ১২ দিন!
প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধ ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে চালু হওয়া ‘মিড ডে মিল’ কর্মসূচি মানিকগঞ্জের ঘিওর ও দৌলতপুরে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। নির্ধারিত খাদ্যতালিকার বিপরীতে অনিয়মিত সরবরাহ, কম পরিমাণ ও নিম্নমানের খাবার পাওয়ার অভিযোগ করেছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশের ১৫০টি উপজেলায় চালু হওয়া স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় ২০২৭ সাল পর্যন্ত ১৯ হাজার ৪১৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩১ লাখের বেশি শিক্ষার্থীকে সপ্তাহে পাঁচ দিন পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার কথা। তবে মানিকগঞ্জের ঘিওর ও দৌলতপুর উপজেলার ১৮০টি বিদ্যালয়ের প্রায় ২৩ হাজার শিক্ষার্থী এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১৭ নভেম্বর থেকে দৌলতপুরের ১০০টি ও ঘিওরের ৮০টি বিদ্যালয়ে কর্মসূচি শুরু হয়। কিন্তু ২৫ নভেম্বর থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত ৫৪টি কার্যদিবসের মধ্যে মাত্র ১২ দিন শিক্ষার্থীদের দুধ দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ডিম ও বনরুটি দেওয়া হয়েছে ১২ দিন, আর বিস্কুট একদিনও দেওয়া হয়নি। সরকার নির্ধারিত খাদ্যতালিকা অনুযায়ী সপ্তাহে পাঁচ দিন শিক্ষার্থীদের বনরুটি, ডিম, দুধ, বিস্কুট ও মৌসুমি ফল পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা মিলছে না।
দৌলতপুর উপজেলার ৩৬ নং সমেতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, ১৩১ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১১৮জনকে সপ্তাহে পাঁচদিন খাবার দেয়ার কথা। কিন্তু ২৬ নভেম্বর থেকে ১৫ এপ্রিল পর্য়ন্ত ৫২ স্কুল কার্যদিবসের মধ্যে বিতরণের জন্য ১২ দিনের প্রাণ কোম্পানির দুধ সরবরাহ পেয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। কলা পেয়েছে দুদিন আর ডিম ও বনরুটি পেয়েছে ৮দিন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহানারা আক্তার বলেন, ‘২৬ নভেম্বর হঠাৎ করে প্রাণ কোম্পানির প্রতিনিধিরা এসে তিনদিনের জন্য ২০০ গ্রামের প্যাকেট করে দুধ দিয়ে যান। ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে তিন দিন করে দুধ দেয়া। এরপর ২৯ মার্চ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত দুই দিন কলা ও ৮দিন ডিম ও বনরুটি দেয়া হয়। তবে কলাগুলো কাঁচা ও বনরুটিগুলো শুকনো খড়খড়া ছিল বলে জানান তিনি।
উপজেলার বৈন্যা, দৌলতপুর-২ ও আমতলীসহ বেশ কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঘুরে একই চিত্র পাওয়া গেছে। তবে শিক্ষকরা জানিয়েছেন, প্রতিদিনই নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম ডিম ও বনরুটি দেয়া হচ্ছে। ১৫ এপ্রিল ৬৬ নং বৈন্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১১ পিস ডিম ও ৬ পিস বনরুটি কম দেয়া হয়। ১০ নং আমতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৯পিস ডিম ও ৭ পিস বনরুটি কম দেয়া হয়।
আমতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ মেছের আলী বলেন, আমাদের ২৫৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২২৭ জনকে খাবার দেয়ার কথা। ২৬ নভেম্বর থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত ৩ হাজার ৮ প্যাকেট দুধ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও ৮৫৩ পিস ডিম, ১ হাজার ৩৩৮ পিস বনরুটি ও ২৪৯ পিস কলাপ দেয়া হয়েছে।
শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের যে খাবার দেয়া হচ্ছে, তা অত্যন্ত নিম্ন মানের। বনরুটিগুলো শুকনো, বাসি এবং সাইজে ছোট। কলাগুলো কাঁচা। ডিম একদিন আগের সিদ্ধ করা।
এদিকে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফিডিং কর্মসূচি’ বাস্তবায়নে ৮ সদস্যের একটি মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এই কমিটির সভাপতি এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সদস্য সচিব। এছাড়াও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকতা, উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর, উপজেলা নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক ও সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের মেম্বার বা ইউএনও র্কর্তক মনোনীত প্রতিনিধি এই কমিটির সদস্য।
ঘিওর ও দৌলতপুর দুই উপজেলাতেই খাবার সরবরাহ করছে ‘সমতা ট্রেডার্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা ১৭/বি, আকমল খান রোড (৪র্থ তলা), বাবু বাজার, ঢাকা। প্রতিষ্ঠানের অপারেশন ম্যানেজার বাকি প্রধান বলেন, জ্বালানী সংকট ও পলী শিট সংকটের কারণে দুদিন সাদা প্যাকেটে বনরুটি দেয়া হয়েছে। বিষয়টি আমরা প্রকল্প পরিচালক, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও ইউএনওকে অবগত করেছি। শনিবার থেকে আবার সরকারি লোগা সংবলিত প্যাকেটে বনরুটি দেওয়া হচ্ছে।
বাকি প্রধান বলেন, সপ্তাহে অন্তত একবার আমাদের পক্ষ থেকে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে সরাসরি এবং ভার্চুয়ালি নিয়মিত যোগাযোগ করা হয়। কোথাও সমস্যা হলে আমাদের জানালে আমরা তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নেব।
তবে দৌলতপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর ফিরোজ বলেন, “খাবারে অনিয়ম সম্পর্কে বিভিন্ন স্কুল থেকে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। তবে এই প্রকল্পের ঠিকাদার কে তা আমরা জানি না। শুধু শুনি ঠিকাদারের লোকজন খাবার দিচ্ছে। খাবারের মান ভালো না। অভিযোগের বিষয়ে জানতে ঠিকাদারের লোকজনকে ইউএনও ডেকেছেন।”
একই অবস্থা দেখা গেছে ঘিওর উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। উভাজানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তীর্থঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তাড়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাকজোর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও তরাসহ বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ে কর্মসূচি শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ করা হয়নি।
কাকজোর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখনো পর্যন্ত কোন দুধ দেয়া হয়নি। উভাজানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২৩৫ জন শিক্ষার্থীকে ২৫ নভেম্বর ৪৬২ প্যাকেট, ৮ ডিসেম্বর ৬৯৩ প্যাকেট, ২ ফেব্রুয়ারি ৬৯৫ প্যাকেট ও ২৮ ফেব্রুয়ারি ৬৯৩ প্যাকেট দুধ দেওয়া হয়েছে। এই সময়ে মৌসুমী ফল, ডিম, বনরুটি ও বিষ্কুট দেওয়া হয়নি।চলতি বছরের ২৯ মার্চ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত ৭ দিন ডিম, ৯ দিন বনরুটি ও দুই দিন কলা দেয়া হয়েছে।
শিক্ষকরা জানিয়েছেন, বনরুটি ও কলার মান অত্যন্ত নিম্নমানের। রুটিগুলো শুকনো ও খড়খড়ে। মনে হয় বাসি রুটি। প্রথম দুদিন সরকারি লোগো লাগানো প্যাকেটে যে রুটি দেয়া হয়েছিল, সেগুলো ভালো ছিল। সাইজে বড় ও নরম ছিল। এরপর থেকে সাদা প্যাকেটে সিল দিয়ে যে রুটি দেয়া হচ্ছে সেগুলো সাইজে যেমন ছোট, তম শক্ত ও খড়খড়া।
ঘিওর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও মিড ডে মিল কর্মসূচি কমিটির সভাপতি নাশিতা-তুল ইসলাম বলেন, “বিষয়টি আমি অবগত নেই। এ বিষয়ে আমার কাছে কোন অভিযোগ করেনি। ঠিকাদারের কেউ আমার সঙ্গে কোন যোগাযোগ করেনি। আপনার কাছ থেকেই প্রথম শুনলাম। বিষয়টি আমি লুক-আফটার করবো।”