নিজস্ব প্রতিবেদক
২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, 6:47 PM
জাল ভিসা–ভুয়া ম্যানপাওয়ারের ফাঁদে কোটি টাকার প্রতারণা
* লেবানন গন্তব্যে প্রবাস স্বপ্ন ভাঙার নেপথ্যে খলিলুর রহমান মাসুম—ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নথিতে একাধিক অসঙ্গতি*
উন্নত জীবনের আশায় লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশে কাজের সন্ধানে ছুটছেন হাজারো বাংলাদেশি। সেই স্বপ্নকেই পুঁজি করে গড়ে উঠেছে একটি সংগঠিত প্রতারণা চক্র—এমন অভিযোগ একাধিক ভুক্তভোগীর।
_*অভিযোগের কেন্দ্রে বরিশালের নলছিটির*_ খলিলুর রহমান মাসুম। ভুক্তভোগীদের দাবি, জাল ভিসা, ভুয়া ম্যানপাওয়ার ও নকল বিমান টিকিট সরবরাহ করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এই প্রতিবেদকের কাছে একাধিক ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগ, অডিও–ভিডিও সাক্ষ্য, ব্যাংক লেনদেনের কপি, ভিসা ও বিএমইটি ইসি কার্ড–এর নথি সংরক্ষিত আছে।
প্রাথমিক নথি বিশ্লেষণে কয়েকটি গুরুতর অসঙ্গতি ধরা পড়েছে—যা গভীর তদন্তের দাবি রাখে।
অভিযোগের সূচনা: ১৯ জন শ্রমিক, ৭০ লাখ টাকার লেনদেন
লেবাননপ্রবাসী কুমিল্লার জাইদুল (ছদ্মনাম) লেবাননে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসে রাষ্ট্রদূতের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।_*অভিযোগপত্রে উল্লেখ*_ বাংলাদেশ থেকে ১৯ জনকে লেবাননে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কয়েক ধাপে মোট ৭০ লাখ টাকা নেওয়া
হয়টাকা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব নম্বরে জমা দিতে বলা হয়েছিল বলে দাবি।
ভিসা ও ম্যানপাওয়ার নথি হাতে পাওয়ার পর যাচাইয়ে সেগুলো জাল বলে সন্দেহ দেখা দিলে অভিযুক্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দেন—এমনটাই অভিযোগ।
জাইদুল বলেন,
_*আমি সর্বস্বান্ত। দেশে ফিরতে পারছি না, মানুষের টাকা কীভাবে শোধ করব জানি না।*_ আমার মতো আরও অনেকে প্রতারিত হয়েছেন।
_*নারী ভুক্তভোগীর অভিযোগ: ২৩ লাখ টাকা প্রতারণা*_
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নোয়াখালীর এক নারী লেবাননপ্রবাসী কর্মী জানান, তার কাছ থেকে ৯ লাখ এবং তার বোনের কাছ থেকে ১৪ লাখ টাকা নেওয়া হয়। অভিযোগ—তাদেরও জাল ভিসা ও নকল নথি দেওয়া হয়েছে।
তার ভাষায়,
“আমরা বারবার যোগাযোগ করেছি, কিন্তু কোনো সমাধান পাইনি। আমাদের মতো আরও অনেকেই পথে বসেছে।”
নথি বিশ্লেষণ: কোথায় অসঙ্গতি?
_*প্রতিবেদকের হাতে আসা ভিসা ও বিএমইটি ইসি কার্ড–এর কপিতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো লক্ষ করা গেছে:*_
১️.ভিসার তারিখসংক্রান্ত অসামঞ্জস্য
একটি ভিসায় দেখা যায়:
ইস্যু তারিখ: ১২/০৯/২০২৫
বৈধতার শেষ তারিখ: ১২/০৯/২০২৫
অর্থাৎ ইস্যুর দিনই মেয়াদ শেষ—যা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক।
অন্য একটি ভিসায়:
ইস্যু তারিখ: ১৯/০৯/২০২৫
বৈধতার শেষ তারিখ: ১৭/১২/২০২৫ (৯০ দিনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ)
তবে দুই ভিসার নকশা, ফন্ট ও নিরাপত্তা প্যাটার্নে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে—যা বিশেষজ্ঞ যাচাই প্রয়োজন।
২️.পাসপোর্ট ইস্যু ও ভিসা ইস্যুর সময়রেখা
বিএমইটি ইসি কার্ড–এ উল্লেখ:
পাসপোর্ট ইস্যু তারিখ: ২৮/০৯/২০২৫
কিন্তু একটি ভিসার ইস্যু তারিখ: ১২/০৯/২০২৫
অর্থাৎ পাসপোর্ট ইস্যুর আগেই ভিসা ইস্যু—যা প্রক্রিয়াগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
৩️.সিরিজ নম্বর ও কাঠামোগত মিল
দুই ভিসাতেই:
ভিসা নম্বর সিরিজ ৪২০৮*****
তফসিল নম্বর প্যাটার্নে মিল
বারকোড বিন্যাস প্রায় একই
এটি বৈধও হতে পারে; তবে একাধিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে ধারাবাহিক সিরিজ ব্যবহার ও কাঠামোগত মিল বিশেষজ্ঞ ফরেনসিক যাচাই দাবি করে।
অভিযোগ অনুযায়ী সম্ভাব্য সহযোগীরা
ভুক্তভোগীদের তথ্যমতে, বাংলাদেশে অবস্থানরত কয়েকজন ব্যক্তি এ কাজে সহায়তা করেছেন বলে অভিযোগ—শাহাদাত, নুরু মিয়া, হেলাল উদ্দিন, রাকিব সরকার এবং মাসুমের স্ত্রী মাহফুজা বেগমের নাম উঠে এসেছে।
এছাড়া প্রতারণার সুবিধার্থে একাধিক ছদ্মনাম ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে—খলিলুর রহমান, মাসুম, বিল্লাল, আলী ইত্যাদি।
অভিযুক্তের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্তের লেবানন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন রিসিভ হয়নি।
তার স্ত্রীর নম্বরেও যোগাযোগ করা হয়েছে; সেখান থেকেও সাড়া মেলেনি।
অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হবে।
আইনি প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে বৈদেশিক কর্মসংস্থান সংক্রান্ত প্রতারণা দণ্ডনীয় অপরাধ।
মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান আইন
ডিজিটাল জালিয়াতি ও প্রতারণা সম্পর্কিত ফৌজদারি বিধান
এসব আইনের আওতায় প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাল ভিসা ও ভুয়া ম্যানপাওয়ার শুধু আর্থিক প্রতারণা নয়—এটি মানবপাচারের ঝুঁকিও তৈরি করে।
*প্রাতিষ্ঠানিক যাচাইয়ের দাবি*
ভুক্তভোগীরা লেবাননে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
প্রস্তাবিত যাচাই:
লেবাননের সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা দপ্তরে ভিসা নম্বর যাচাই
বিএমইটি রেইমস সিস্টেমে ইসি কার্ড যাচাইকরণ
সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স পরীক্ষা
ব্যাংক লেনদেন অনুসরণ
বৃহত্তর চিত্র: প্রবাস স্বপ্নের আড়ালে প্রতারণা
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে প্রতারক চক্রগুলো লক্ষ্য নির্ধারণ করছে। দ্রুত সমন্বিত তদন্ত না হলে এ ধরনের চক্র আরও বিস্তৃত হতে পারে।
উপসংহার
নথিতে একাধিক অসঙ্গতি, ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য, উল্লেখযোগ্য অঙ্কের লেনদেন—সব মিলিয়ে অভিযোগগুলো গুরুতর। তবে চূড়ান্ত সত্য উদ্ঘাটনে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় সংস্থার নিরপেক্ষ তদন্ত।
ভুক্তভোগীদের ভাষায়,
_*দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে সাধারণ মানুষ নিরাপদ থাকবে না।*_
*এ বিষয়ে অনুসন্ধান চলমান:* ভুক্তভোগীদের দেওয়া নথি, অডিও–ভিডিও ও সাক্ষাৎকার প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত আছে। *পরবর্তী পর্বে ব্যাংক লেনদেনের বিশ্লেষণ ও সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক সংযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।*