জাহিদুল ইসলাম শিশির
৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫, 9:55 PM
এভার কেয়ারের সামনে আজ একটু অন্য রকম ভীড় : অশ্রু বলছে তিনি চলে গেলেন
জাহিদুল ইসলাম শিশির:
এভার কেয়ারের সামনে আজ একটু অন্য রকম ভীড়। শোকাহত, অশ্রুসিক্ত মানুষেরা আজ বড় বেশী উদাসীন। কেউ কেউ আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড় বিড় করে কী যেন বলছেন। মানুষের এই আবেগ মেশানো অশ্রু বলে দিচ্ছে তিনি চলে গেছেন।
রাজধানীর এই এভার কেয়ার হাসপাতালটা, যিনি চলে গেলেন তার বেশ প্রিয় এবং চেনা ছিলো। বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের সাথে এই হাসপাতালটি ইতিহাসের অংশ হয়ে গেল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রতীক আপোশহীন বেগম জিয়া।
আজ আমাদের শহীদ হাদিীরা যে ভারতীয় আধিপাত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে প্রাণ দিয়ে ইতিহাসের নায়ক হযে উঠেছে সেই ভারতীয় আধিপাত্যবাদের বিরুদ্ধে দেশের সর্বেোচ্চ ক্ষতায় থেকে এই বেগম জিয়াই স্পষ্ঠ্য অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন এদেশে ভারথীয় আধিপাত্য বাদ চলবে না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ভারতীয় আধিপাত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামটা তাকেই শুরু করতে হবে। সত্যিই তিনি তা করেছিলেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি যখনে ঢাকা সফর করেন তখন তিনি তার সাথে দেখা করেননি। এতেই তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে ভারতীয় আধিপাত্যবাদী শক্তি। সেই থেকে একে একে এই বেগম জিয়াকে সইতে হয়েছে হাজারো নিপীড়ন। ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তির সেবাদাস ফ্যাসিস্ট হাসিনার সরকার বেগম জিয়াকে বছরের পর মিথ্যে মামলায জেলে রেখেছেন। আধিপাত্যবাদী শক্তির মিডিয়া তাকে খল নায়িকা বানাতে নানা কাহিনী ফেদেছে। সন্তনকে হারাতে হয়েছে। অন্যসন্তান নির্যাতিত হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েচেন। নিজের ঘর বাড়ী সব কেড়ে নেয়া হয়েছে। অথচ তখনো তিনি ছিলেন দেশ মাতৃকার পক্ষে অনড় এক মহা শক্তি। তারই দৃড়তায় এবং বার্তা বুকে ধারণ করেই এ দেশের তরুণ প্রজন্ম বুকের তাজা রক্ত ঢেলে ভাতীয় সেবাদাস শেখ হাসিনাকে উৎখাত করেছে। নিশ্চিত করেছে স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখার প্রজন্মের প্রতিশ্রুতি। বেগম জিয়ার সাহসী উচ্চারণ এ মাটির গভীরে ভারতীয় আধিপাত্য বাদের বীজ মাটির সুগভীরে রোপন করে গেছে। যা বার বার জন্মাবে। যতবার ভারতীয় আধিপাত্যবাদ এখানে মাথাতুলে দাড়াবার চেষ্টা করবে। ততবারই মাটির গভীরে রেখে যাওয়া খালেদা জিয়ার আদর্শের সন্তানেরা তা প্রতিহত করতে জেগে উঠবে। তারা বুলেটের সামনে বুক চেতিয়ে দিয়ে বলবে আমরা আছি। ভয় কেন মা কর। সেই অঅপোসহীন নেতৃর চির অভিযাত্রার দিনে তাই মানুষ এত আবেগতাড়িত। এত অশ্রসিক্ত। এ যেন এক মহামানবের মহা সম্মানের বিদায়ী সম্ভাষন।
কনকনে শীতের মধ্যেও হাজারো মানুষ হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে। বলেছেন তাঁদের অভিব্যক্তির কথা। সকাল থেকে সন্ধ্যা হাসপাতালের সামনে ভিড় লেগেই ছিল।নানাজন নানাভাবে তাদের স্মৃতি চয়ন করে চলেছেন।
অধিকাংশের বক্তব্য - ‘ম্যাডাম নিজের জন্য কিছু করেননি, সব করেছেন দেশের জন্য। ওনাকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়েছিল, কিন্তু তিনি যাননি। উনি দেশেই শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন। এটাও তার সফলতা।
রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে কালের ছবিকে কথাগুলো বলছিলেন ত্বনি জাহান। বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবরে রাজধানীর মিরপুর থেকে ছুটে আসেন এই নারী।
খালেদা জিয়া (৭৯) আজ মঙ্গলবার সকাল ছয়টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। তাঁর জানাজা আগামীকাল বুধবার বাদ জোহর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা ও এর সংলগ্ন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত হবে। তাঁকে তাঁর স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে দাফন করা হবে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে শোকাহত মানুষ ভিড় করতে থাকেন। বিএনপির নেতা–কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষ—সবাই ছিলেন অশ্রুসিক্ত। হাসপাতাল চত্বর ও আশপাশের এলাকায় তৈরি হয় শোকস্তব্ধ এক পরিবেশ।
সরেজমিনে দেখা যায়, দিনভর হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের কেউ কেউ দল বেঁধে আবার কেউ কেউ বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করছেন। কাউকে মোনাজাত করতেও দেখা যায়। একে অন্যের সঙ্গে খালেদা জিয়াকে নিয়ে স্মৃতিচারণাও করেন অনেকে।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা আরিফ হাসনাত কালের ছবিকে বলেন, ‘আমি নব্বইয়ের আন্দোলন দেখেছি। ম্যাডাম আমাদের শুধু নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন সাহস ও অনুপ্রেরণার নাম। তিনি শুধু দলের নেত্রী ছিলেন না, আমাদের কাছে ছিলেন আন্দোলনের শক্তি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক।’ কথাগুলো বলার সময় তাঁর চোখ বেয়ে অশ্রু পড়ছিল।
অনেকে এসেছিলেন কালো ব্যাজ পরে। কেউ হাতে ধরে আছেন জাতীয় পতাকা, কেউ খালেদা জিয়ার ছবি, কারও হাতে বিএনপির দলীয় পতাকা। শোকাবহ পরিবেশ।
দুপুরের দিকে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, কেরানীগঞ্জসহ ঢাকার আশপাশের এলাকা থেকে মানুষ আসতে থাকেন। মোরশেদ আলম নামের এক যুবক বলেন, ‘আমি গাজীপুর থেকে এসেছি। কাজ ফেলে চলে এসেছি। মনে হচ্ছিল, না এলে অপরাধ হবে।’
হাসপাতালে আসা অনেকেই খালেদা জিয়াকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করছিলেন। কেউ বলছিলেন আন্দোলনের দিনের কথা, কেউ বলছিলেন কারাবাসের সময় তাঁর দৃঢ়তার গল্প। মধ্যবয়সী মামুন মিয়া বলেন, ‘অনেক নির্যাতন, অসুস্থতা—কিছুই তাঁকে ভাঙতে পারেনি। সেই মানুষটাকে আর দেখতে পাব না, এটা মানতে কষ্ট হচ্ছে।’
রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি খালেদা জিয়াকে শেষবারের মতো দেখতে বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যাক্তিরাও হাসপাতালের সামনে এসেছিলেন। কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন, মনির খানও এসেছিলেন হাসপাতালের সামনে।
হাসপাতালের আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের মধ্যেও শোকের আবহ স্পষ্ট ছিল। কেউ কেউ বলছিলেন, খালেদা জিয়া কেবল একটি দলের নেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন দেশের রাজনীতির প্রতীক। রিকশাচালক আল আমিন বলেন, ‘আমি রাজনীতি অতটা বুঝি না। কিন্তু খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর শুনে বড় মনটা খারাপ হয়ে গেল।’
’